শিকড়

” শিকড় “

জসীমউদ্দীন , কত দিন ওই গায়ে যাওনি তুমি !

তোমার নকশী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট ,

উড়ানীর চর এখনও কি পড়ে আছে আগের মতন ,

যেমনটি তুমি দেখেছিলে এই গ্রাম বাংলায় –

বিমুগ্ধ চোখে অভিভুত হয়ে বিস্তীর্ণ বালুচরে

এখনো কি গরু চরায় গায়ের রাখাল গামছা গায়ে –

উদাসী বাউল একতারায় মারফতী গায় পরমাত্মার প্রেমে ।

দুর অতিদুর থেকে ভেসে আসে কি বাঁশের বাঁশীর ভাটিয়ালী সুর

তোমার হাসু কেমন আছে জানো কি তা একপয়সার বাঁশী

এখনো কি কেনা যায় চৈতের মেলায় অথবা পুথির মালা দু এক ছড়া !

তোমার বৃদ্ধ কৃষক দাদু এখনো কি কেঁদে ফেরে

স্বজনের কবরের পাশে অহর্ণিশ

নয়নের জলে ভাসে অনুক্ষণ সকরুণ ।

তোমার চিত্র গাঁথা ম্লান আজি জলচ্ছ্বাসের বন্যায়

জলে স্থলে বিভৎস ছবি ! তুমি তো কবি

তোমার হৃদয় হোত ভেঙ্গে চৌচির অস্থির নজীরবিহীন

অথবা স্পন্দনহীন জসীমউদ্দীন ।

আজ বাংলার বড় দুর্দিন সিডরের তান্ডবে নেই কারো আবাসন

তোমার কৃষক এখন নিথর বিবর্ণ পাণ্ডুর সম্পদহীন

আকাশে বাতাসে স্বজন হারা কান্না আহাজারি

চারদিকে লাশ আর লাশ, চেনা মুখ চেনা দায় ,

ফুলে ফেঁপে পচে গলে একাকার বর্ণগোত্রহীন

ঠিকানাবিহীন জসীমউদ্দীন ।

আমরা আজ বড়ো শহুরে হয়েগেছি ,

ভুলে গেছি রবি কবির অমোঘ বানী এবার ফেরাও মোরে ।

দিন দিন আয়ুক্ষীণ স্বজনবিহীন জসীমউদ্দীন ।

সেই মেঠো পথ আম কাঁঠালের বন এখন অচেনা

নদীর ঘাটের বুড়ো বট গাছটিও চেনা দায়

অথচ ওই বটের তলায় আমার প্রথম নামতা শেখা

এখন কোন চেনা মুখের নেই দেখা ,

আসলে তোমাকেও ভুলে গেছি জসীমউদ্দীন ,

এই সেদিনও তুমি কত নিবির ভাবে ছিলে আমাদের মাঝে ।

আমার গাঁয়ের নদী মধুমতি দিয়া — বেদের বহর ভাসিয়া চলেনা

কূলে ঢেউ আছাড়িয়া ।

তোমার নিমন্ত্রণ পেয়েও কেউ আর গ্রামে আসেনা –

নাড়ার আগুনে কেউ আর মটর কলাই পোড়ায়ে খায়না !

তুমি তো আমাদের শিকড় জসীমউদ্দীন ।

যতদিন তোমাকে আকড়ে না থাকবো – আমরা যথার্থই ভাসবো ,

আর ভাসবো অনন্তকাল ধরে , নাড়ীহীন শিকর বিহীন – জসীমউদ্দীন !